মৃত্যুর আগে রুমকী : ‘বাবা, আমি আর বাঁচবো না, নিজের দিকে খেয়াল রেখো’

0
89

‘বাবা আমি আর বাঁচবো না, আমার জন্য দোয়া করিও, তোমার নিজের ও ভাইদের খেয়াল রাখিও।’ আর এরপরই বন্ধ হয়ে যায় রুমকীর মোবাইল ফোনটি। বৃহস্পতিবার রাজধানী ঢাকার বনানীর এফআর টাওয়ারে অগ্নিকাণ্ডে বাবা আশরাফ আলীকে ফোন করে এসব কথা বলেছিলেন নীলফামারীর রুমকী আক্তার। বৃহস্পতিবার দুপুরে রাজধানীর বনানীর এফআর টাওয়ারে অগ্নিকাণ্ডে মারা যান রুমকী আক্তার ও তার স্বামী মাকসুদুর রহমান জেমি।

নিহত রুমকী নীলফামারীর জলঢাকা উপজেলার কৈমারী ইউনিয়নের চেংমারী বিন্যাকুড়ি গ্রামের আশরাফ আলীর মেয়ে। আর তার স্বামী নিহত মাকসুদুর রহমান জেমি রাজধানী ঢাকার গেন্ডারিয়া এলাকার মৃত. মিজানুর রহমানের ছেলে।

জানা যায়, গত ছয় বছর ধরে হেরিটেজ এয়ার এক্সপ্রেস নামের একটি ট্রাভেল এজেন্সিতে কাজ করছিলেন রুমকী ও মাকসুদ। চাকরির সুবাদেই গত তিন বছর আগে উভয় পরিবারের সম্মতিতে বিয়ে করেন রুমকী ও মাকসুদুর রহমান জেমি। রুমকী পাঁচ মাসের অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন বলে জানিয়েছেন তার বড় চাচা জলঢাকা উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান সৈয়দ আলী।

হেরিটেজ এয়ার এক্সপ্রেস ট্রাভেল এজেন্সি কতৃপক্ষ জানিয়েছে, রুমকী আক্তার এই প্রতিষ্ঠানের হিসাব বিভাগে এবং মাকসুদুর রহমান ট্যুর প্যাকেজ বিভাগে কর্মরত ছিলেন।

শুক্রবার বেলা পৌনে ১১টার দিকে নীলফামারীর জলঢাকা উপজেলার কৈমারী ইউনিয়নের চেংমারী বিন্যাকুড়ি গ্রামস্থ রুমকীর বাবার বাড়ির সামনের উঠোনে শোকাহত শত শত মানুষকে বসে থাকতে দেখা যায়। আর বাড়ির ভিতরে চলছে স্বজনদের আহাজারি।

দুপুর সোয়া বারোটায় একটি লাশবাহী অ্যাম্বুলেন্সে নিহত রুমকীর লাশ তার গ্রামের বাড়িতে এসে পৌছলে শুরু হয় স্বজনদের আহাজারিতে শোকাবহ পরিবেশ আরো ভারী হয়ে ওঠে। পরিবারের সদস্যদের সাথে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন এলাকার হাজারো মানুষ।

অগ্নিকাণ্ডে নিহত রুমকীর বাবা আশরাফ আলী জানান,‘বৃহস্পতিবার বেলা ১২টা ৪৫ মিনিটে আমার মোবাইলে ফোন কল করে মেয়ে রুমকী। সে সময় রুমকী জানায়,‘বাবা অফিসে আগুন লেগেছে। গোটা অফিসে আগুন ছড়িয়ে পড়েছে। বাবা জানিনা বাঁচবো কিনা, দোয়া করিও। তোমার জামাইকে পাচ্ছিনা, জানিনা তোমাদের সাথে আমাদের আর দেখা হবে কিনা? বাবা তুমি নিজের প্রতি এবং ভাইয়াদের প্রতি খেয়াল রাখিও।’

আশরাফ আলী আরো বলেন, এমন ভাবে ১২টা ৫০ মিনিট পর্যন্ত আমার সাথে কথা হয় মেয়ের। এরপর থেকেই মেয়ের সাথে যোগযোগ বন্ধ হয়ে যায়। মেয়ে ও তার স্বামীর কোনো খোঁজখবর না পাওয়ায় বৃহস্পতিবার বিকেলেই ঢাকার উদ্যেশে রওনা হই।

সন্ধ্যা সাতটার দিকে রুমকীর এক দেবর (খালা শাশুড়ির ছেলে) ইমতিয়াজ আহমেদ ফোন করে জানায়,‘অগ্নিকাণ্ডে রুমকী ও তার স্বামী মাকসুদুর মারা গেছে।’ রুমকীর লাশ ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আর মাকসুদুরের লাশ ইউনাইটেড হাসপাতালে আছে। খবর পেয়ে প্রথমে মেয়ের লাশ ও পরে জামাইয়ের লাশ সনাক্ত করি।’

নিহত রুমকীর বড় ভাই রফিকুল ইসলাম রিকো জানান,‘আমরা দুই ভাই ও এক বোন। রুমকী আমাদের ছোট বোন। বিন্যাকুড়ি এস.সি সরকার উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি, জলঢাকা রাবেয়া মহাবিদ্যালয় থেকে এইচএসসি, কারমাইকেল কলেজ থেকে ইসলামের ইতিহাস নিয়ে অনার্স এবং ঢাকার তিতুমীর কলেজ থেকে মাস্টার্স পাশ করে রুমকী। পড়ালেখা শেষে দীর্ঘ ছয় বছর ধরে ঢাকায় হেরিটেজ এয়ার এক্সপ্রেস ট্রাভেল এজেন্সিতে হিসাব বিভাগে চাকরি করছিল রুমকি। তিন বছর আগে তার বিয়ে হয় মাকসুদুর রহমান জেমির সাথে। জেমিও ওই প্রতিষ্ঠানেই কাজ করে। ঢাকাতেই তারা থাকতো।’

নিহত রুমকীর মেজো ভাই রওশন আলী রনী জানান, বৃহস্পতিবার দুপুরে অগ্নিকাণ্ডের সময় বাবার মোবাইল ফোনে কল দেয় রুমকী। ছোট বোন রুমকীর ফোন পেয়ে বিকেলেই বিমানে করে ঢাকার উদ্যেশে যাত্রা করেন বাবা। সন্ধ্যা পৌনে ৭টার দিকে রুমকীর এক দেবর আমাকে ফোন করে জানায়, ছোট বোন রুমকী এবং তার স্বামী জেমি আর বেঁচে নেই।

তিনি আরো জানান,‘ছোট বোন রুমকী গত ১৫ মার্চ ঢাকা থেকে বাড়িতে আসে। তিন দিন বাড়িতে থেকে ১৮ মার্চ ঢাকায় ফিরে যায়। ঢাকা যাওয়ার সময় সে বলেছিল- ভাই ঈদের ছুটিতে বাড়ি আসবো, এক সাথে সব ভাই বোন ঈদ করবো, দোয়া করিস আমি যেন ভালো ভাবে ঢাকায় পৌঁছাতে পারি। বোনের সেই সাধ আর পূর্ণ হলো না। বোন বাড়িতে আসলো ঠিকই কিন্তু লাশ হয়ে।’

নিহত রুমকীর চাচাতো ভাই এম. শরীফুল ইসলাম জানান,‘শুক্রবার বাদ জুমআ বাড়ির পার্শ্ববর্তী মাঠে রুমকীর জানাযা অনুষ্ঠিত হয়। জানাযা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে মায়ের কবরের পাশেই রুমকীকে দাফন করা হয়। অপরদিকে একই সময় ঢাকার গেন্ডারিয়ায় জানাযা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে বাবার কবরের পাশে দাফন করা হয় রুমকীর স্বামী মাকসুদুর রহমান জেমিকে।

রিপ্লে করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here