‘নৈতিকতায়’ রফিকের কাছে হেরে গেলেন অশ্বিন

0
33

সোমবার রাতে এক বিতর্কিত আউট দেখলো ক্রিকেট দুনিয়া। এ নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে শুরু হয়েছে তুমুল আলোচনা-সমালোচনা। কেউ একে নিয়মের মধ্যে ফেলে বৈধতা দিতে চান, কেউ প্রশ্ন তুলেছেন নৈতিকতা নিয়ে।

ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগ- আইপিএলে সোমবার কিংস ইলেভেন পাঞ্জাবের মুখোমুখি হয়েছিল রাজস্থান রয়্যালস। এ ম্যাচে পাঞ্জাবের অধিনায়ক রবিচন্দ্রন অশ্বিন রাজস্থান রয়্যালসের জস বাটলারকে বিশেষ একটি উপায়ে আউট করেন।

স্পিনার অশ্বিন খেয়াল করেন ইংল্যান্ডের উইকেটরক্ষক ব্যাটসম্যান বাটলার তার বল ছাড়ার আগে বোলিং প্রান্তের ক্রিজ ছেড়ে বের হন। তখন অশ্বিন বেল ফেলে দেন এবং আপিল করেন আম্পায়ারের কাছে।

এই সিদ্ধান্ত থার্ড আম্পায়ার দেন এবং সেটা বাটলারের বিপক্ষে যায়। এক উইকেটে ১০৮ রান তুলে ফেলা রাজস্থান শেষ পর্যন্ত ১৪ রানে ম্যাচটা হেরে যায়।

রাজস্থানের ঘরের মাঠে প্রথমে ব্যাট করে ১৮৪ রান করে পাঞ্জাব। রান তাড়া করতে নেমে দারুণ খেলছিল রাজস্থান রয়্যালস। অশ্বিনের করা ত্রয়োদশ ওভারের শেষ বলটাতে দারুণ ছন্দে ৬৯ রান করা জস বাটলার নন-স্ট্রাইকিং প্রান্তে বল ছোড়ার আগেই উইকেট থেকে বেরিয়ে যান। বলটা করতে গিয়েও থেমে গিয়ে উইকেট ভেঙে বাটলারকে বিতর্কিত এক আউট করেন পাঞ্জাবের অধিনায়ক।

আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল- আইসিসি, এমন আউট হবার পর তাদের টুইটার পেজে একটি প্রশ্ন রাখে। বাটলারকে ‘মানকড়’ আউট করার ক্ষেত্রে কি সঠিক কাজ করেন অশ্বিন?

সেখানে ৭২ শতাংশ উত্তর আসে- ‘না’।

এ ঘটনায় আলোচনা এসেছে বাংলাদেশের অলরাউন্ডার মোহাম্মদ রফিকের নাম। পাকিস্তানের সাথে এক ম্যাচে এ ধরনের ‍সুযোগ সামনে এলেও তিনি তার ব্যবহার করেননি। যদি তিনি তা করতেন তাহলে সে ম্যাচটিতে না হেরে বাংলাদেশের প্রথম টেস্ট জয় অবশ্যম্ভাবি হয়ে উঠেছিল। আশাভঙ্গের নিদারুণ এক যন্ত্রণায় ভুগতে হতো না টাইগারদের।

২০০৩ সালের ৬ সেপ্টেম্বর ছিল শনিবার। মুলতানের মাটিতে স্বাগতিক পাকিস্তানের মুখোমুখি বাংলাদেশ। রৌদ্রকরোজ্জ্বল দিনটি শুরু হয়েছিল বিশাল এক উত্সবের অপেক্ষায়। কিন্তু দিনের অর্ধেক সময় পেরোতে না পেরোতেই সেই উত্সবের অপেক্ষা পরিণত হয়েছিল আশাভঙ্গের নিদারুণ এক যন্ত্রণায়। দেশের ক্রিকেট সেদিন নীল হয়েছিল তীরে এসে তরি ডোবার বেদনায়। এই দিনেই প্রথম টেস্ট জয়ের উন্মাতাল আনন্দ থেকে বঞ্চিত হয়েছিল বাংলাদেশ। বঞ্চিত হয়েছিল চরম দুর্ভাগ্যের শিকার হয়ে; ইনজামাম-উল হক নামের এক অসাধারণ ব্যাটসম্যান সেদিন নিজের ব্যাটিংশৈলীর অনুপম প্রদর্শনী ঘটিয়ে বাংলাদেশের হাত থেকে কেড়ে নিয়েছিলেন নিশ্চিত এক জয়। টেস্ট মর্যাদা পাওয়ার আড়াই বছরের মাথায় পাকিস্তানের বিপক্ষে প্রথম টেস্ট জয়ের সমূহসম্ভাবনায় উত্সব-প্রস্তুতি সেদিন বাংলাদেশের জন্য বিষণ্ন কান্নায় পরিণত হয়েছিল। মুলতানে পাকিস্তানের বিপক্ষে এক উইকেটের ব্যবধানে ওই পরাজয় তাই পরিণত হয়েছে বাংলাদেশের ক্রিকেটের চিরকালীন দুঃখে।

জয় থেকে পাকিস্তান তখনো ৫৫ রান দূরে। বল হাতে ওই মুহূর্তে তখন মোহাম্মদ রফিক। একটি দ্রুত রান নিতে গিয়ে ক্রিজ ছেড়ে অনেক দূর বেরিয়ে গিয়েছিলেন উমর গুল। রফিক বল করা বন্ধ করে দিয়ে দাঁড়িয়ে পড়লেন। গুল তখন ক্রিজ ছেড়ে অনেক দূরে। রফিক গুলকে সাবধান করলেন। ফিরে আসতে বললেন ক্রিজে। হাতের মুঠোয় আরও একটি উইকেট পতনের সুযোগ পেয়েও রফিক তা কাজে লাগালেন না কেবল খেলোয়াড়ি উদারতার পরিচয় দিয়ে। নতুন জীবন পেয়ে উমর গুল সহায়তা করতে থাকলেন ইনজামামকে। গুল খেললেন ৯৯টি বল। মাত্র ৫ রান করলেও গুলের ওই ইনিংসটি ঠিক ওই মুহূর্তে দারুণ গুরুত্বপূর্ণ বিবেচিত হয়েছিল। সেই গুল যখন রান আউট হন, তখন পাকিস্তান জয় থেকে মাত্র ৩ রান দূরে।

শেষ পর্যন্ত ইনজামাম পুল করে বল বাউন্ডারির বাইরে আছড়ে ফেলে বাংলাদেশের হত থেকে কেড়ে নেন জয়।

কে কী বলছে?
আইপিএলে এই ঘটনার পুনরাবৃত্তির পর সাবেক ক্রিকেটার ও ধারাভাষ্যকাররা নিজ নিজ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তাদের মতামত প্রকাশ করেন এই আউট নিয়ে।

অস্ট্রেলিয়ার কিংবদন্তী লেগ স্পিনার শেন ওয়ার্ন লেখেন, অধিনায়ক হিসেবে ও মানুষ হিসেবে অশ্বিনের এমন কাজ হতাশাজনক।

‘সব অধিনায়কই আইপিএলের দেয়ালে সই করেন এবং খেলার স্পিরিট ধরে রাখার ব্যাপারে সম্মত হন,’ ওয়ার্নের মতে এমন কাজ ক্রিকেটের নীতির বিরুদ্ধে।

ধারাভাষ্যকার ও ক্রিকেট বিশ্লেষক হারশা ভোগলে অবশ্য নিয়মের কথা বলেন, ‘এই নিয়মটি খেলার স্পিরিট ধরে রাখার জন্যই তৈরি হয়েছিল, যখন একজন ব্যাটসম্যান তার রান পূরণ করতে ছয় ইঞ্চি কম দৌড়ায়।’

নিউজিল্যান্ডের সাবেক ক্রিকেটার স্কট স্টাইরিস অবশ্য থার্ড আম্পায়ারের সিদ্ধান্তকে প্রশ্নবিদ্ধ করেন, ‘এটা বাটলারের বা অশ্বিনের দোষ না, অশ্বিনের আপিল করাই যথার্থ ছিল, এটা থার্ড আম্পায়ারের সিদ্ধান্ত যেটা হওয়ার কথা ছিল ডেড বল।’

ইংল্যান্ডের ওয়ানডে দলের অধিনায়ক এউইন মরগ্যান বলেন, ‘অশ্বিন এটা নিয়ে অনুতাপে ভুগবেন, আমি বিশ্বাস করতে পারছি না যা দেখছি, শিশুদের জন্য বাজে উদাহরণ হয়ে থাকবে এটা।’

আইন কী বলে?
ক্রিকেটের আইন প্রণয়ন করার কমিটি মেরিলিবন ক্রিকেট ক্লাব বা এমসিসি ২০১৭ সালের নভেম্বর মাসে এই আইন প্রণয়ন করে যে নন-স্ট্রাইকে থাকা ব্যাটসম্যান যদি বল ছাড়ার আগেই ক্রিজ ছেড়ে দেয় সেক্ষেত্রে বোলার বেল ফেলে আউট করতে পারেন।

আগের আইনে ছিল, বোলার কেবলমাত্র বোলিং করার আগ মুহূর্তে এভাবে রান আউট করার চেষ্টা করতে পারবেন, কিন্তু এখন যে বোলিংয়ের যে কোনো সময় এটা করা যাবে।

নন-স্ট্রাইকে থাকা ব্যাটসম্যান যাতে আগেই ক্রিজ না ছাড়ে সেজন্যই এই আইন করা হয়।

‘এমনভাবে রান আউট করার চেষ্টা করলে যদিও বোলার সমালোচিত হন, তবু ব্যাটসম্যান এই ক্ষেত্রে একটা সুবিধা নেয়ার চেষ্টা চালায়,’ এমসিসি।

মানকড় নাম যেভাবে এলো
১৯৪৭ সালের ১৩ই নভেম্বর, ইন্ডিয়া ও অস্ট্রেলিয়ার মধ্যকার সিডনি টেস্টে ভিনু মানকড় বিল ব্রাউনকে রান আউট করেন বোলিং করার সময়। তিনি শেষ পর্যন্ত বল ছাড়েননি এবং বেল ফেলে দেন, যার ফলে ব্রাউন আউট হন।

এই সফরে ব্রাউন দুইবার এইভাবে আউট হন।

ব্রাউনকে আউট করার আগে অবশ্য সতর্ক করেন মানকড়। 

সেসময় অস্ট্রেলিয়ান গণমাধ্যমে ভিনু মানকড়ের সমালোচনা করা হয়।

এই ঘটনার পর থেকে এভাবে কেউ আউট হলে সেটাকে ‘মানকড়’ বলা হয়।

বাটলারও একই উপায়ে এর আগে আরেকবার আউট হয়েছিলেন। শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ২০১৪ সালে একটি ওয়ানডে ম্যাচে সাচিত্রা সেনানায়েকে বাটলারকে নন-স্ট্রাইক প্রান্তে আউট করেন।

রিপ্লে করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here