ছন্নছাড়া বোলিং নিয়ে দুশ্চিন্তায় বাংলাদেশ দল

0
52
ছন্নছাড়া বোলিং নিয়ে বিপাকে ‘বাংলাদেশ দল।

ট্রেন্ট ব্রিজে পরশু ইনিংস বিরতিতে বাংলাদেশের দর্শকদের শুকনো মুখ দেখেই বোঝা যাচ্ছিল, খানিক আগে অস্ট্রেলিয়ান ব্যাটসম্যানরা কী ধ্বংসযজ্ঞটাই না চালিয়েছেন! এত রান তাড়া করবে কীভাবে? সাকিব-তামিম-মুশফিকদের পক্ষে আদৌ সম্ভব? কত চিন্তা তাঁদের। দর্শকদের হতাশ করেনি বাংলাদেশ, দুর্দান্ত লড়াই হয়েছে। ওয়ানডে ইতিহাসে নিজেদের সর্বোচ্চ ৩৩৩ রান করেছে। কী আসে-যায় এ পরিসংখ্যানে, যেখানে ম্যাচটাই হাত থেকে ফসকে গেছে।

ম্যাচ তো ফসকে গেছে অস্ট্রেলিয়া ইনিংসের পরই—ম্যাচ শেষে স্টেডিয়াম ছাড়ার পথে এক দর্শক তাঁর যত ক্ষোভ ঝাড়লেন বোলারদের ওপর, ব্যাটসম্যানরা এই বিশ্বকাপে ধারাবাহিক ভালো খেলছেন। বোলাররা বড় ছন্নছাড়া।

ভুল বলেননি। ব্যাটিংটা খুব ভালো হচ্ছে—বাংলাদেশ টুর্নামেন্টে তিনবার ৩০০ পেরিয়েছে। এ বিশ্বকাপেই দুবার নিজেদের সর্বোচ্চ ইনিংসের রেকর্ড ভেঙেছে। মাথাব্যথার যত কারণ ‘ছন্নছাড়া’ বোলিং। পরশু অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে বাংলাদেশের বোলিং এতটাই হতশ্রী, ষষ্ঠ বোলারের খোঁজে সৌম্য সরকারের শরণ নিতে হলো এবং টুর্নামেন্টে প্রথমবারের মতো বোলিং করতে আসা সৌম্যই কিনা ৫৮ রানে ৩ উইকেট নিয়ে পরশু বাংলাদেশ দলের সফলতম বোলার!

শুধু অস্ট্রেলিয়া ম্যাচ নয়, বাংলাদেশের বিশৃঙ্খল বোলিং দেখা যাচ্ছে টুর্নামেন্টের শুরু থেকেই। ওভালে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচটা বাদে একটিতেও বলার মতো ভালো করতে পারেননি বোলাররা। বিশ্বকাপের হাই স্কোরিং উইকেটে ৩০০ রানের বেশি হওয়া যেখানে নিয়মিত ঘটনা, সব দলের বোলাররা চেষ্টা করছেন উইকেট শিকারের চেয়ে লাইন-লেংথ আর জায়গা ঠিক রেখে সর্বোচ্চ কৃপণ বা নিয়ন্ত্রিত বোলিং করতে।

এটি এখন পর্যন্ত সবচেয়ে ভালো করতে পেরেছেন নিউজিল্যান্ডের বোলাররা, এ কারণে পয়েন্ট তালিকায় তাঁদের এত শক্ত অবস্থান। সর্বোচ্চ উইকেট শিকারে কোনো কিউই বোলার নেই। কিন্তু গড়ে ৪.৫ ইকোনমি রেটে তাঁরাই সবার ওপরে। শৃঙ্খল বোলিংয়ে দুইয়ে আছে ভারত (গড় ইকোনমি ৫.২৪), তিনে ইংল্যান্ড (৫.৩৬)। পয়েন্ট তালিকায় দেখুন এ তিন দলই আছে শীর্ষ চারে। সেরা চারে থাকা দলগুলোর মধ্যে একটু ব্যতিক্রম অস্ট্রেলিয়া। বোলারদের ঘাটতি তারা পুষিয়ে নিচ্ছে অসাধারণ ব্যাটিং করে।

মুক্তহস্তে রান বিলানোয় সবচেয়ে এগিয়ে বাংলাদেশের বোলাররা। বাংলাদেশ যে পাঁচ ম্যাচ খেলেছে, চারটিতেই হজম করেছে ৩০০-এর বেশি রান। ওভালে দক্ষিণ আফ্রিকা করেছে ৮ উইকেটে ৩০৯, কার্ডিফে ইংল্যান্ড ৬ উইকেটে ৩৮৬, টন্টনে ওয়েস্ট ইন্ডিজ ৮ উইকেটে ৩২১ আর ট্রেন্ট ব্রিজে ৫ উইকেটে ৩৮১। বাংলাদেশের বিপক্ষে প্রতিপক্ষ গড়ে তুলেছে ৩২৯ রান—বোলারদের ইকোনমি সাতের কাছাকাছি। মেহেদী হাসান মিরাজ (৫.৫৯) আর মোসাদ্দেক হোসেন (৫.৯৫) বাদে কেউ পাগলা ঘোড়ার মতো ছুটতে থাকা ইকোনমির কাঁটা ছয়ের নিচে নামাতে পারেননি। ৪ ম্যাচে ৯ উইকেট নিয়ে দলের সর্বোচ্চ উইকেটশিকারি সাইফউদ্দিন ওভারপ্রতি ৭.২৯ রান দিয়ে বসে আছেন! প্রায় প্রতি ম্যাচে সাতের ওপর রান দেওয়ার তালিকায় আছেন মোস্তাফিজুর রহমানও। ব্যাটিংয়ে দুর্দান্ত ছন্দে আছেন সাকিব আল হাসান। বোলিংয়েও দলের অন্যতম ভরসা এ বাঁহাতি অলরাউন্ডারের কাছ থেকে এখনো দেখা যায়নি তাঁর বোলিং-জাদু। এই কন্ডিশন আর খড়খড়া উইকেট বের করতে না পারুন, কিন্তু ইকোনমিটা তো ছয়ের নিচে নামাতে হবে। দলের মূল বোলারদের যদি এই ত্রাহিমধুসূদন অবস্থা হয়, ব্যাটসম্যানরা আর কটা ম্যাচ জিতিয়ে আসবেন!

পরশু ম্যাচ শেষে মাশরাফি বিন মুর্তজার সংবাদ সম্মেলনেও উঠল প্রসঙ্গটা। পাঁচ ম্যাচের চারটিতেই ৩০০-এর বেশি রান হজম করেছে বাংলাদেশ। এলোমেলো এ বোলিংই কি তবে সেমিফাইনালে না উঠতে পারার বড় কারণ হয়ে দাঁড়াবে শেষ পর্যন্ত? মাশরাফি তাঁর বোলিং বিভাগকে অবশ্য এখনই কাঠগড়ায় তুলতে চান না, ‘যদি ইংল্যান্ডের উইকেট কিংবা সবকিছু দেখেন, জানি, এটা হাই স্কোরিং ম্যাচ হতে পারে। বিশেষ করে যে মাঠে আজ (পরশু) খেললাম। সেটাই হয়েছে। ৩০০-২৮০ রানের উইকেট এটা নয়। যেটা জানতে চাইছিলেন, ইংল্যান্ডের বিপক্ষে এবং আজকের (পরশু) ম্যাচে ৩৮০ হয়েছে। এ উইকেট ব্যাটসম্যানদের জন্যই। আমাদের ব্যাটসম্যানরাও কিন্তু এখানে ভালো করেছে। তবে হ্যাঁ, ৩০০ পেরোনো ম্যাচগুলোর প্রতিটিই আমরা ৩০-৪০ রান করে বেশি দেওয়ার মূল্য দিয়েছি।’

‘বেশি’ দিয়ে ফেলার কাজটা ‘কম’ করলেই আজ শেষ চারে ওঠার সম্ভাবনা উজ্জ্বল থাকত বাংলাদেশের। সেটি না হওয়ায় বাংলাদেশকে পাড়ি দিতে হচ্ছে অনিশ্চিত এক পথ।

রিপ্লে করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here