ইমরান-সাথীর ঘর বাঁধার স্বপ্ন কেড়ে নিলো সেই দুর্ঘটনায়

0
110
সিলেট থেকে রওনা দেওয়ার পর শেষ সেলফিতে সাদিয়া আক্তার সাথী ও ইমরান হোসেন। পেছনে তিন বন্ধু আকিব, সজল ও জান্নাত। পাঁচজনের মধ্যে বেঁচে আছেন শুধু সজল (মাঝে)- ফেসবুক থেকে

গতকাল দৈনিক সচেতন বার্তাই প্রকাশিত শিরোনাম “নরসিংদিতে বাস-প্রাইভেট কার সংঘর্ষে বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩ শিক্ষার্থীসহ নিহত ৪” এ খবরের বিস্তারিত

দুর্ঘটনাই নিহত সাথীর জন্য পছন্দসই পাত্র পেয়ে কয়েকদিন আগে একমাত্র মেয়েকে বিয়ে দিয়েছিলেন রাজধানীর খিলগাঁওয়ের বাসিন্দা মোরশেদুর রহমান খোকন। পাত্র মগবাজারের নয়াটোলার বাসিন্দা ইমরান হোসেনের সঙ্গে গত ৬ আগস্ট পারিবারিকভাবে আক্‌দ সম্পন্ন হয় সাদিয়া আক্তার সাথীর। এর ১০ দিনের মাথায় গতকাল শনিবার বিকেলে খোকন পেলেন প্রিয় কন্যা ও জামাতার প্রাণহীন দেহ।

যন্ত্রদানব পিষে দিয়ে গেছে এই নবদম্পতির নতুন সংসার সাজানোর স্বপ্ন। কন্যার নিথর দেহ দেখে বাকরুদ্ধ হয়ে বসে পড়েন সাথীর বাবা খোকন। আত্মীয়-স্বজনের গগনবিদারী কান্নার শব্দও যেন তার মুখে ভাষা ফোটাতে পারছিল না।

সাথী রাজধানীর বেসরকারি মিলেনিয়াম ইউনিভার্সিটির এমবিএ শেষ সেমিস্টারের মেধাবী শিক্ষার্থী। মাত্র দেড় সপ্তাহ আগে বিয়ে হওয়ায় তার দু’হাত ছিল মেহেদির রঙে রাঙানো। সামনের মাসে এমবিএর চূড়ান্ত পরীক্ষা শেষ হওয়ার পরই তাকে তুলে নেওয়ার কথা ছিল। শুক্রবার মধ্যরাতে নরসিংদীর কারারচরে মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান সাথী (২৪) ও ইমরান (৩০)। জীবনের পথ একত্রে পাড়ি দিতে না পারলেও অনন্তলোকে একসঙ্গেই পাড়ি জমালেন নবদম্পতি। ইমরানই প্রাইভেট কারটি চালাচ্ছিলেন। সঙ্গে ছিলেন সাথীর আরও তিন বন্ধু। ঈদের ছুটিতে সিলেটে বেড়াতে গিয়েছিলেন তারা।

নরসিংদী প্রতিনিধি জানান, শিবপুরের কারারচরে যাত্রীবাহী বাসের সঙ্গে প্রাইভেট কারের সংঘর্ষে রাজধানীর বেসরকারি মিলেনিয়াম ইউনিভার্সিটির তিন শিক্ষার্থীসহ চারজন নিহত হন। এ ঘটনায় গুরুতর আহত হন আরও পাঁচজন। শুক্রবার দিবাগত রাত সাড়ে ৩টার দিকে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে কারারচর এলাকার মদিনা জুটমিলের সামনে এ দুর্ঘটনা ঘটে।

পুলিশ ও স্থানীয়রা জানান, প্রাইভেট কারে পাঁচজন ছিলেন। সিলেটে থেকে ঢাকায় ফেরার পথে সিলেটগামী শ্যামলী পরিবহনের একটি বাসের সঙ্গে প্রাইভেট কারটির মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। এতে প্রাইভেট কারটি দুমড়েমুচড়ে যায়। ভেতরে থাকা পাঁচ যাত্রীর তিনজন ঘটনাস্থলেই নিহত হন। হাসপাতালে নেওয়ার পথে আরও একজন মারা যান। সজল (২৫) নামে আরেকজনকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মুমূর্ষু অবস্থায় ভর্তি করা হয়।

উল্লেখ্য যে, এই শ্যমলী পরিবহনের মালিক হিন্দু পরিষদের একটি সভায় বক্তব্যে বলেন, “যে পর্যন্ত ভারত বাংলাদেশ এক না হবে আমি আর বাংলাদেশে যাবো না। তিনি তার বক্তব্যে এটাও ইঙ্গিত করেন যে, বাংলাদেশে ধুতী পড়ে চলা য্য না। ভিডিও লিঙ্ক https://www.facebook.com/groups/CHIRKUT2017/permalink/946388415715294/ সিলেট,সুনামগঞ্জ, কক্সবাজার হতে ঢাকা অভিমুখে শ্যামলী পরিবহনের যে সকল গাড়ী যাতায়াত করে তার অধিকাংশের ড্রাইভার, সুপারভাইজাররা মাদক বহনের সাথে জড়িত। বহুবার তারা পুলিশের হাতা ধরাও পরে। দ্রুতবেগে বেপরোয়া গাড়ি চালানোর অন্যতম একটি কারন এই মাদক বহন।

সংঘর্ষের পর বাসটিও নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পাশের খাদে পড়ে যায়। বেপরোয়া গতিতে পাশ কাটাতে গিয়ে এ দুর্ঘটনা ঘটে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করছে পুলিশ ও দমকল বাহিনী।

নিহত অন্য দু’জন হলেন ঢাকার খিলগাঁও এলাকার মৃত রফিকুল ইসলামের মেয়ে জান্নাত (২৫) এবং উত্তর গোড়ান এলাকার রেজাউল হক সুমনের ছেলে আকিবুল হক রিফাত (২৭)। এদের মধ্যে জান্নাত ও রিফাত মিলেনিয়াম বিশ্ববিদ্যালয়ের এমবিএর শিক্ষার্থী। ইমরান, জান্নাত ও রিফাত ঘটনাস্থলেই নিহত হন। নরসিংদী জেলা হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসকরা সাথীকে মৃত ঘোষণা করেন।

একই দিনে চাচা-ভাতিজির মৃত্যু :গতকাল বিকেলে রাজধানীর খিলগাঁও চৌরাস্তা পেরিয়ে কুমিল্লা হোটেলের কাছে যেতেই দেখা যায় এলাকাবাসীর ভিড়। সাথীদের বাসা এখানেই। বাসায় ঢুকতেই আত্মীয়-স্বজনের কান্নার শব্দ। সাথীর মা বারবার জ্ঞান হারাচ্ছিলেন। পরে স্বজনরা তাকে ধরে তার বোনের বাসায় নিয়ে যান। বিকেলে সাড়ে ৩টার দিকে সাথীর মরদেহ এসে পৌঁছলে স্বজনরা কান্নায় ভেঙে পড়েন। পরে খিলগাঁও বটতলা জামে মসজিদে নিয়ে যাওয়া হয় তার লাশ। সেখানে জানাজা শেষে খিলগাঁও ঝিলপাড় কবরস্থানে তার লাশ দাফন করা হয়। অন্যদিকে ইমরানের লাশ নিয়ে যাওয়া হয় মগবাজারে তার বাসায়।

সাথীর বন্ধু সোহাগ জানান- জান্নাত, আকিব ও সজলকে নিয়ে গত বুধবার রাতে হানিফ পরিবহনের বাসে সাথী সিলেটে যান। বৃহস্পতিবার নিজের প্রাইভেট কার নিয়ে তাদের সঙ্গে যোগ দেন ইমরান। মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে একদিন থাকার পর তারা সিলেটের বিছনাকান্দি যান। সেখান থেকে ঢাকায় ফিরে আসার পথেই কারারচরে দুর্ঘটনা ঘটে।

সাথীর বাবা খোকন জানান, খিলগাঁও এলাকায় ভাড়া বাসায় থাকেন তারা। পৈতৃক বাড়ি পাবনার সুজানগরে। তার দুই সন্তানের মধ্যে সাথী ছোট। অনেক কষ্টে তাকে এমবিএ পর্যন্ত পড়িয়েছেন। একমাত্র ছেলে ফার্নিচারের ব্যবসা করে। তিনি বলেন, ইমরানকে পছন্দ হওয়ায় তার সঙ্গে মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন। ইমরান ডেকোরেটর ও ইভেন্ট ম্যানেজমেন্টের ব্যবসা করেন। শুক্রবার দুপুর ১২টার দিকে সাথীর সঙ্গে মুঠোফোনে তার শেষ কথা হয়। সাথী জানান, খোকনের এক ভাই মারা গেছেন। তার দাফনে শরিক হতে তিনি পাবনা রওনা দেন। আরিচাঘাট পর্যন্ত যাওয়ার পর শনিবার ফজরের ওয়াক্তে তিনি কন্যার মৃত্যুর খবর পান। এ কথা বলেই ডুকরে কেঁদে ওঠেন তিনি।

মিলেনিয়াম ইউনিভার্সিটির উপাচার্য অধ্যাপক অভিনয় সাহা বলেন, তাদের মেধাবী তিন শিক্ষার্থীর মৃত্যু খুবই বেদনাদায়ক। তারা অত্যন্ত শোকাহত। এ বিশ্ববিদ্যালয়ের এমবিএ কো-অর্ডিনেটর অধ্যাপক আশরাফ আলী বলেন, নিহত তিনজনই এ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিবিএ করেছিল। তাদের এমবিএ শেষ হতে আর মাত্র এক মাস বাকি ছিল।

দুর্ঘটনায় নিহত অন্য শিক্ষার্থী আকিবুল হক রিফাতের বাসাও উত্তর গোড়ানে। গতকাল বিকেলে তার বাসায় গিয়ে দেখা যায়, রিফাতের লুঙ্গি বুকে চেপে ধরে হাউমাউ করে কেঁদে চলেছেন তার মা। তিনি বার বার বলছিলেন, ‘বাপরে এই লুঙ্গি খুইল্যা থুইয়্যা গেলি। আর তো আয়তি না। মারে রাইখ্যা ক্যামেতে গেলি।’ কাঁদতে কাঁদতে তিনি বলতে থাকেন, ‘দুনিয়্যা দিয়া দিমু, আমার বাপরে আইন্যা দেও। তার বুকফাটা কান্নায় ভারি হয়ে ওঠে আকাশ-বাতাস।’

নিহত আকিবের মায়ের আহাজারি। ছবিঃ সংগৃহিত।

রিফাতের বাবা রেজাউল হক সুমন জানান, তার দুই সন্তানের মধ্যে ছোটটি প্রতিবন্ধী। রিফাতই তাদের একমাত্র অবলম্বন ছিল। বলতে বলতে তিনিও ডুকরে কেঁদে ওঠেন। তিনি জানালেন, রিফাত ইস্টার্ন ব্যাংকের গুলশান প্রধান শাখায় চাকরির পাশাপাশি মিলেনিয়াম ইউনিভার্সিটিতে এমবিএ পড়ছিলেন। খুবই মা-ভক্ত ছিলেন রিফাত।

রিফাতের জন্য পরিবারের সবাই যখন বিলাপ করছিলেন, ঠিক তখনই খবর আসে তার বড় চাচা জাকের পার্টির কেন্দ্রীয় নেতা নুরুল হক পনিরও মারা গেছেন। তিনি ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে রাজধানীর ল্যাবএইড হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন। একই দিনে একই পরিবারের দু’জনের আকস্মিক মৃত্যুতে শোকে মুহ্যমান হয়ে পড়েন পরিবারের সদস্যরা।

রিফাতের মা জানান, শুক্রবার রাতে শেষ কথা হয়েছিল ছেলের সঙ্গে। ফোনে সে উচ্ছ্বসিত হয়ে মাকে জানান, ‘তোমার জন্য সুন্দর একটি শাড়ি কিনেছি সিলেট থেকে। সকালে দেখা হবে।’

রিফাতের নিষ্প্রাণ দেহ নিয়ে বিকেল সাড়ে ৫টায় অ্যাম্বুলেন্স এসে পৌঁছায় বাসার গেটে। স্বজনরা ধরাধরি করে মরদেহের কাছে মাকে নিয়ে যেতেই মূর্ছা যান তিনি। রিফাতের ফুফাতো বোন লিমা আক্তার জানান, আকিবের গ্রামের বাড়ি নরসিংদীর পাঁচদোনায়। গত রাতে আকিবের নানাবাড়ি গাজীপুরের মেঘডুবিতে জানাজা শেষে তার লাশ দাফন করা হয়।

রিপ্লে করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here