বাপেক্সর আবিষ্কার আর মূল্যায়নের নাম বিদেশী গাজপ্রমকে

0
64
ভোলার সম্ভাবনাময় গ্যাসক্ষেত্রগুলো আবিষ্কার করেছে বাপেক্স। তারপরও রাশিয়ার গাজপ্রমের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে মূল্যায়নের তোড়জোড় চলছে।

দেশি বাপেক্সের চেয়ে বিদেশি গাজপ্রমে বেশি আগ্রহ সরকারের। ভোলার সম্ভাবনাময় গ্যাসক্ষেত্রগুলো আবিষ্কার করেছে বাপেক্স। তারপরও রাশিয়ার গাজপ্রমের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে মূল্যায়নের তোড়জোড় চলছে।

গাজপ্রমের সঙ্গে সমঝোতা করার দরকার পড়ল কেন, জানতে চাইলে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ সাংবাদিকদের বলেন, তাঁরা যা করবেন, দেশের স্বার্থ রক্ষা করেই করবেন। তবে গাজপ্রমের সঙ্গে যৌথ মূল্যায়ন সমীক্ষার বিষয়ে যেমন, ঠিক তেমনি যৌথ সহযোগিতায় গ্যাস আহরণের বিষয়েও জোরালো দ্বিমত আছে।

“ভোলার শাহবাজপুর গ্যাসক্ষেত্র থেকে ১০ বছর ধরে গ্যাস উত্তোলন করে আসছে রাষ্ট্রীয় কোম্পানি বাপেক্স। ভোলাতেই গত বছর আরেকটি গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার করেছে রাষ্ট্রীয় এই কোম্পানি। এরপরও দেশের দক্ষিণের দ্বীপজেলা ভোলায় গ্যাসের সম্ভাব্য মজুত মূল্যায়নের নামে বাপেক্সের সঙ্গে রাশিয়ার তেল–গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনকারী প্রতিষ্ঠান গাজপ্রমকে (আন্তর্জাতিক) যুক্ত করতে চাচ্ছে সরকার। এ লক্ষ্যে বাপেক্সের সঙ্গে গাজপ্রমের যৌথ সমীক্ষার সমঝোতা স্মারকও (এমওইউ) চূড়ান্ত করা হয়েছে।

“অন্য কারও সহায়তা ছাড়াই বাপেক্স ভোলা থেকে সফলভাবে গ্যাস উত্তোলন করার পরও সরকার কেন এই এমওইউ করতে যাচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তেল-গ্যাস খাতের সঙ্গে যুক্ত বিশেষজ্ঞরা। তাঁরা বলছেন, এর মাধ্যমে একদিকে রাষ্ট্রীয় কোম্পানি বাপেক্সের কর্তৃত্ব খর্ব করা হবে, অন্যদিকে গাজপ্রমকে গ্যাস উত্তোলনের কাজে যুক্ত করলে সরকার আর্থিকভাবেও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এ ছাড়া গাজপ্রমকে ২০১২ সালে দেশের যে ১০টি গ্যাসকূপ খননের দায়িত্ব (ঠিকাদারি) দেওয়া হয়েছিল, সে অভিজ্ঞতা মোটেও ভালো ছিল না।

“রাষ্ট্রীয় তেল-গ্যাস ও খনিজ সম্পদ করপোরেশনের (পেট্রোবাংলা) ২০১৬ সালের এক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী গাজপ্রমের প্রথম দফায় খনন করা গ্যাসকূপগুলোর পাঁচটিই (তিতাস-২০, তিতাস-২১, সেমুতাং-৬, বেগমগঞ্জ-৩ ও শাহবাজপুর-৪) বালু ও পানি উঠে বন্ধ হয়ে যায়। সেগুলো পরে বাপেক্সকেই মেরামত করে গ্যাস উত্তোলনের উপযোগী করার দায়িত্ব নিতে হয়।

“তেল-গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনের জন্য রাশিয়া বা রুশ ফেডারেশনের রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থার নাম গাজপ্রম পিজেএসসি। আন্তর্জাতিক গাজপ্রম সেটারই নিয়ন্ত্রণাধীন প্রতিষ্ঠান। আর বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানি লিমিটেড (বাপেক্স) একই কাজের জন্য সরকারের পেট্রোবাংলার নিয়ন্ত্রণাধীন প্রতিষ্ঠান। গাজপ্রমের সঙ্গে এমওইউ করার বিষয়টি নিয়ে বাপেক্সের আগামী বোর্ড সভায় (চলতি মাসে, তারিখ ঠিক হয়নি) আলোচনা হতে পারে।

জ্বালানি সহযোগিতা নিয়ে বাংলাদেশ ও রাশিয়া একসঙ্গে কাজ করার বিষয়ে সম্মত হওয়ার সাত বছর পর ২০১৭ সালের ১ জুন দুই দেশের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক সই হয়। তারপর যৌথ কাজের পরিকল্পনার একটি খসড়া সময়সূচি ঠিক করা হয়। তালিকায় ভোলা গ্যাসক্ষেত্র মূল্যায়নে সমঝোতা স্মারকের কথা ছিল। আরও ছিল ভোলা, ছাতক ও পার্বত্য চট্টগ্রামে কূপ খনন এবং সাগরে ভূকম্পন জরিপের কথা।

গত বছরের শেষ ভাগে রাশিয়া ও বাংলাদেশ বাণিজ্য, অর্থনীতি, বিজ্ঞান ও কারিগরি বিষয়ে একটি প্রটোকল স্বাক্ষর করে। সেটাতে ওপরের প্রস্তাব ও পরিকল্পনাগুলো সমর্থন পায়। এই প্রটোকলে গাজপ্রমের ভূমিকাকে গুরুত্ব দেওয়ার কথা ছিল। অবশ্য প্রটোকলটি পালনের আইনগত কোনো বাধ্যবাধকতা নেই।

গাজপ্রম বরাবরই বাংলাদেশ সরকারকে যৌথ সহযোগিতায় কূপ খননের প্রস্তাব দিয়ে আসছে। সর্বশেষটি ছিল গত ১৮ এপ্রিল ভোলায় ১২টি কূপ খনন ও গ্যাস সঞ্চালনের পাইপলাইন বসানোর জন্য। এসব বিষয়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের জ্বালানি বিভাগের সচিব, গাজপ্রমের এবং পেট্রোবাংলা ও বাপেক্সের শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তাদের মধ্যে বহুবার চিঠি–চালাচালি হয়েছে।

“এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক বদরূল ইমাম সাংবাদিকদের বলেন, যৌথ মূল্যায়ন মূলত একটি অজুহাত। ভোলায় গ্যাসের ভালো মজুত আছে বুঝতে পেরে গাজপ্রম কয়েক বছর ধরেই গ্যাস উত্তোলনে বাপেক্সের সঙ্গে যৌথ সহযোগিতা চুক্তির প্রস্তাব দিচ্ছে। যৌথ মূল্যায়নের পথ ধরে রাশিয়ার প্রতিষ্ঠানটি আসলে সেখান থেকে গ্যাস উত্তোলনের পথে যেতে চায়। যৌথ উত্তোলন চুক্তি করতে পারলে সংস্থাটি ঠিকাদারির চেয়েও বেশি লাভ করতে পারবে।”

রিপ্লে করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here