জামিন ‘বেচাকেনা’ লাখ লাখ টাকায়

0
29

আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানে আট হাজার পিস ইয়াবাসহ ধরা পড়েন এক ব্যক্তি। তার জামিনের জন্য চেষ্টা চালান আত্মীয়স্বজন। সহজেই যাতে তার জামিন মেলে, সে জন্য কাগজপত্রে আট হাজার পিস ইয়াবাকে বানিয়ে দেওয়া হয় মাত্র ২০০ পিস। আবার দুটি আগ্নেয়াস্ত্রসহ ধরা পড়েন এক যুবক। কিন্তু জামিনের পথ প্রশস্ত করতে কাগজপত্রে বলা হয়, তার কাছে কিছু মেলেনি। নিতান্তই সন্দেহের বশে ধরা হয়েছে তাকে। জামিন পেয়েই লাপাত্তা হয়ে গেছে সে।

এ ধরনের জালিয়াতির ঘটনা ঘটছে মাঝেমধ্যেই। গত এক বছরে উচ্চ আদালতের নজরে আসা এমন অন্তত ১০টি ঘটনায় মামলা হয়েছে শাহবাগ থানায়। মামলাগুলোর তদন্তের বরাত দিয়ে পুলিশ বলছে, অপরাধের ধরন বুঝে দুই থেকে ১৪ লাখ টাকার চুক্তিতে হয় জামিন জালিয়াতির কারবার। কোনো মামলায় সাত লাখ টাকায় বদলে যায় ইয়াবার পরিমাণ। কোনো মামলায় চার লাখ টাকায় আধা কেজি হেরোইন হয়ে যায় ৪৮ গ্রাম। জালিয়াতির এই অসাধু চক্রে মুহুরি, পেশকার ও কারারক্ষী ছাড়াও আছেন কয়েকজন আইনজীবী।

অসাধু এই আইনজীবীরা জাল কাগজপত্র তৈরির পাশাপাশি প্রয়াত আইনজীবীর বার আইডি নম্বর ব্যবহার করে ওকালতনামা পেশ করেছেন। আবার জামিন পেলেও কারামুক্তির আগেই জালিয়াতি ধরা পড়ায় টাকা ফেরত দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, সতর্কতার সঙ্গে সব নথি যাচাই করে নিলে এ ধরনের ঘটনা এড়ানো সম্ভব।

জামিন জালিয়াতি বেড়ে যাওয়ার ঘটনা উচ্চ আদালতের নজরেও এসেছে। গত ২২ মে একটি মামলার শুনানির সময় বিচারপতি জাহাঙ্গীর হোসেন ও রিয়াজ উদ্দিন খানের হাইকোর্ট বেঞ্চ মন্তব্য করেন, ‘সুপ্রিম কোর্টে জামিন জালিয়াতির ঘটনা দিন দিন বেড়েই চলেছে। এর সঙ্গে কিছু অসাধু আইনজীবী জড়িত। এর হাত থেকে আদালতকে রক্ষা করতে হবে।’

এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি এ এম আমিন উদ্দিন সমকালকে বলেন, কোনো আইনজীবী যদি সত্যিই এমন অপরাধে জড়িয়ে পড়েন, তবে তার সর্বোচ্চ শাস্তি হওয়া উচিত। কারণ, তিনি পেশাকে অসম্মানিত করেছেন। তবে তিনি কোনোভাবে প্রতারিত হয়ে থাকলে ভিন্ন কথা। সাধারণত তরুণ আইনজীবীরা এ ধরনের ভুল করে থাকেন। তাদের এসব ব্যাপারে সতর্ক থাকা উচিত। সব নথি যাচাই করে নিলে প্রতারণার সুযোগ কমে যাবে।

এসব মামলার তদন্ত প্রসঙ্গে শাহবাগ থানার ওসি আবুল হাসান বলেন, জামিন জালিয়াতির মামলাগুলো অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। কয়েকটি মামলায় জড়িত আইনজীবীসহ অন্যদের গ্রেফতার করা হয়েছে। এসব মামলার পলাতক আসামিদের গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে।

জামিন জালিয়াতির অংশ হিসেবে মামলার এজাহার, এফআইআর, পুলিশ প্রতিবেদন, পুলিশ ফরোয়ার্ডিং লেটার, থানার ওসি, তদন্ত কর্মকর্তা ও ম্যাজিস্ট্রেটের স্বাক্ষর এবং আদালতের আদেশসহ সব নথি জাল করে চক্রের সদস্যরা। এ ক্ষেত্রে কখনও আসল কাগজপত্রে ঘষামাজা করা হয়। তবে বেশির ভাগ সময় হুবহু নকল তৈরি করে তারা, যা সাধারণভাবে দেখে বোঝার উপায় থাকে না। সেসব কাগজপত্র আদালতে দিয়ে আসামির জামিন আবেদন করেন অসাধু আইনজীবীরা। এ রকম কিছু ঘটনা ধরা পড়ার পর সংশ্নিষ্টরা এখন সতর্ক হয়ে উঠেছেন।

ইয়াবার সংখ্যা কমাতে সাত লাখ টাকা :২০১৮ সালের মার্চে কুমিল্লায় আট হাজার পিস ইয়াবাসহ ধরা পড়েন সাজ্জাদ হোসেন। এ ঘটনায় ১৭ মার্চ কোতোয়ালি মডেল থানায় তার বিরুদ্ধে মামলা হয়। তার জামিনের চেষ্টা চালান স্ত্রী রুনা বেগম। এরই মধ্যে হাজিরার দিন আদালতে সাজ্জাদের সঙ্গে মুহুরি নূর হোসেনের কথা হয়। তিনি হাইকোর্টের মুহুরি হুমায়ুনের মাধ্যমে জামিনের ব্যবস্থা করার আশ্বাস দেন। এরপর তিনি কুমিল্লা জেলা কারাগারের কারারক্ষী অলি ও সিভিল কোর্টের অফিস সহকারী বিল্লাল হোসেনের মাধ্যমে হুমায়ুনের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। জামিনের ব্যবস্থা করার জন্য ৯ লাখ টাকা চেয়ে বসেন হুমায়ুন। তবে রফা হয় সাত লাখ টাকায়। রুনা বিল্লালের মাধ্যমে নূর হোসেনকে এক লাখ টাকা অগ্রিম দেন। নূর তা পৌঁছে দেন হুমায়ুনকে।

হুমায়ুন আইনজীবী মার্জিয়া জামান ওরিনের সহকারী হিসেবে কাজ করেন। তার মাধ্যমে মামলার নথি পেয়ে ওই আইনজীবী ‘ফাইলিং ল ইয়ার’ হিসেবে মামলাটি পরিচালনা করেন। সাজ্জাদকে জামিন দেন উচ্চ আদালত। গত বছরের ১৩ সেপ্টেম্বর হুমায়ুন জামিন হওয়ার কথা জানিয়ে বাকি ছয় লাখ টাকা চান। রুনা ও বিল্লাল এসএ পরিবহনের মাধ্যমে নূর হোসেনের কাছে সেই টাকা পাঠিয়ে দেন। এরপর কারারক্ষী অলির মাধ্যমে রুনা জামিন-সংক্রান্ত কাগজপত্র দেন স্থানীয় আইনজীবীকে। তিনি কাগজপত্র পরীক্ষা করে জানান, ‘বেলবন্ডে’ জালিয়াতি করে আট হাজার পিস ইয়াবার বদলে ২০০ পিস দেখানো হয়েছে।

জামিন জালিয়াতির এ ঘটনায় হাইকোর্টের এক কর্মকর্তা শাহবাগ থানায় মামলা করেন। চলতি বছরের ২৬ আগস্ট রাতে রাজধানীর মাতুয়াইলের পশ্চিম রায়েরবাগ থেকে নূর হোসেনকে গ্রেফতার করে পুলিশ। জিজ্ঞাসাবাদে তিনি জামিনের প্রক্রিয়ায় যুক্ত থাকা ও সাত লাখ টাকা নেওয়ার কথা স্বীকার করেন। ‘বেলবন্ডের’ জালিয়াতি সম্পর্কে হুমায়ুন দাবি করেন, টাইপ করার সময় ভুল হয়েছে। এর মধ্যে হাইকোর্ট থেকে সাজ্জাদের বিরুদ্ধে জালিয়াতির মামলা হয়। তার স্ত্রী রুনা আবারও হুমায়ুনের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। এরই মধ্যে হুমায়ুন ফোন বন্ধ করে পালিয়ে যান। অ্যাডভোকেট মার্জিয়া জামান আদালতে জানান, নথি জালিয়াতি বা টাকা নেওয়ার বিষয়ে তার কিছুই জানা নেই। এদিকে নূর হোসেন বলেছেন, জামিন বাবদ নেওয়া টাকার মধ্যে ছয় লাখ ৪৬ হাজার তিনি রুনাকে ফেরত দিয়েছেন।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা শাহবাগ থানার এসআই মনজুর হোসেন বলেন, রুনা বেগমের সঙ্গে মোবাইল ফোনে একাধিকবার কথা বলেছেন আসামি নূর হোসেন। সেসব রেকর্ড পেয়েছে পুলিশ। টাকা লেনদেন ও জামিন জালিয়াতির বিষয়ে জিজ্ঞাসা করলে তিনি সবকিছু আইনজীবী ও মুহুরির কাঁধে চাপানোর চেষ্টা করেন। তবে এসএ পরিবহনের মাধ্যমে তার পাঠানো ছয় লাখ টাকার একটি স্লিপ জব্দ করেছে পুলিশ।

চার লাখ টাকায় আধা কেজি হেরোইন হলো ৪৮ গ্রাম :মাদক-সংক্রান্ত মামলায় ২০১৬ সালের ১৭ অক্টোবর রাজশাহীর গোদাগাড়ীতে আশরাফুল ইসলাম বাবুকে গ্রেফতার করা হয়। তার কাছে পাওয়া যায় ৫৫০ গ্রাম হেরোইন। তবে জামিনের জন্য আদালতে জমা দেওয়া কাগজপত্রে উল্লেখ করা হয় মাত্র ৪৮ গ্রাম হেরোইনের কথা। রাজশাহী জজকোর্টের আইনজীবী সালাহ উদ্দিন বিশ্বাস ফাইলিং ল ইয়ার হিসেবে এ মামলা পরিচালনা করেন। তার জালিয়াতির বিষয়টি ধরা পড়ার পর চলতি বছরের ১৯ মার্চ শাহবাগ থানায় মামলা হয়। তদন্তে নেমে পুলিশ অ্যাডভোকেট সালাহ উদ্দিন বিশ্বাস, রিফাত জাহান, আইনজীবী পরিচয় দেওয়া শিউলি আক্তার, ওয়াসিম আকরাম রুবেল ও মুহুরি বাচ্চুকে গ্রেফতার করে।

মামলাটির তদন্ত কর্মকর্তা শাহবাগ থানার এসআই অমল কৃষ্ণ দে জানান, জামিন পাইয়ে দেওয়ার জন্য আসামির স্বজনদের কাছ থেকে চার লাখ টাকা নিয়েছিল চক্রটি। জামিনের কাগজপত্র নিম্ন আদালতে গেলে জালিয়াতি ধরা পড়ে। তখন পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) স্থানীয় কর্মকর্তারা ঘটনার প্রাথমিক তদন্ত করে সত্যতা পান। পরে সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রারের দপ্তরের সুপারিনটেনডেন্ট মজিবর রহমান বাদী হয়ে এ ঘটনায় মামলা করেন।

এজাহারে বলা হয়েছে, রাজশাহীর দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে কয়েক দফা বাবুর জামিনের আবেদন নাকচ হয়। এরপর হাইকোর্টে তার জামিন চাওয়া হয়। ২০১৮ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ তার জামিন মঞ্জুর করেন। পরে রাজশাহীর বিচারিক আদালতে ‘বেলবন্ড’ দিলে জালিয়াতি ধরা পড়ে।

আইনজীবী সালাহ উদ্দিন বিশ্বাসের বিরুদ্ধে আরও অভিযোগ রয়েছে। ২০১৭ সালের ৮ অক্টোবর পাঁচ কেজি হেরোইন জব্দ করে র‌্যাব। এ ঘটনায় মামলার আলামত পরিবর্তন করে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়া হয়। অভিযোগ ওঠার পর পুলিশের পাঁচ সদস্যের কমিটি ঘটনা তদন্ত করে। তাদের প্রতিবেদনে ছয় আইনজীবীকে মাদক ব্যবসায়ীদের জামিনে সহায়তাকারী হিসেবে উল্লেখ করা হয়। তাদের মধ্যে সালাহ উদ্দিন বিশ্বাস ছিলেন অন্যতম। হেরোইনের আলামতের প্রতিবেদন পাল্টে ফেলারও প্রমাণ পায় কমিটি।

দুই অস্ত্র মামলায় ভেল্ক্কি :২০১৬ সালের নভেম্বরে রাজধানীর মুগদা থানার এক অস্ত্র মামলায় হুমায়ুন কবির ঝুনুকে গ্রেফতার করে পুলিশ। তার কাছে পাওয়া যায় দুটি আগ্নেয়াস্ত্র। আরও দুটি অস্ত্র পাওয়া যায় মামলার অপর আসামিদের কাছে। তবে ঝুনুর জামিন আবেদনের সময় মামলার সব তথ্য বদলে ফেলা হয়। আসামি ছয়জনের স্থানে দেখানো হয় চারজন। কাগজপত্রে উল্লেখ করা হয়, ঝুনুর কাছে কিছুই পাওয়া যায়নি। ২০১৭ সালের মার্চে তিনি জামিন পান। একপর্যায়ে জালিয়াতির বিষয়টি ধরা পড়লে একই বছরের ২৭ জুলাই শাহবাগ থানায় মামলা করা হয়। এই জালিয়াতির জন্য অন্তত দুই লাখ টাকা লেনদেনের কথা জানা গেছে।

এ মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই রহিদুল ইসলাম বলেন, জামিন পেয়ে প্রতিবেশী একটি দেশে পালিয়ে যান ঝুনু। তার ওকালতনামা আদালতে দাখিল করেন কথিত আইনজীবী শফিকুল ইসলাম। তদন্তে দেখা যায়, তার দেওয়া বার আইডি নম্বর ভুয়া। সেটি প্রয়াত এক আইনজীবীর আইডি নম্বর।

২০১৮ সালের ২৭ জানুয়ারি শাহবাগ থানায় নথিভুক্ত জালিয়াতির আরেক মামলায় (নম্বর ৫২) দেখা যায়, রংপুরের মিঠাপুকুরে অস্ত্র-গুলিসহ ধরা পড়েন পিচ্চি আপেল। জামিন আবেদনের সঙ্গে দেওয়া কাগজপত্রে পুরো ঘটনাই পাল্টে দেওয়া হয়। নকল কাগজপত্রে বলা হয়, এ মামলার মূল আসামি ডলার। তার সহযোগী সন্দেহে আপেলকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তার কাছে কিছু পাওয়া যায়নি। এভাবে আপেল জামিন নেন। পরে বিষয়টি নজরে আসে সংশ্নিষ্টদের। ততক্ষণে আপেল জামিন নিয়ে লাপাত্তা। এ মামলায় অভিযুক্ত ক্লার্ক তোফাজ্জল হোসেন মিন্টু ও আনোয়ারুল হককে গ্রেফতার করে পুলিশ। পলাতক আছেন অ্যাডভোকেট মাসুদুজ্জামান ও আজিজুল ইসলাম।

এই জালিয়াতির বিনিময়ে আইনজীবী ও তার সহযোগীরা কয়েক লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। তবে গ্রেফতার দু’জনের মধ্যে আনোয়ারুল প্রাথমিকভাবে ১২ হাজার ও তোফাজ্জল ৯ হাজার টাকা পাওয়ার কথা স্বীকার করেছেন।

মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি জামিন নিয়ে উধাও :মেয়েকে বিয়ে দিতে রাজি না হওয়ায় ২০১০ সালের ২৪ মার্চ গুলশানের কালাচাঁদপুরের বাসায় ব্যবসায়ী সাদেকুর রহমান ও তার স্ত্রী রোমানা নার্গিসকে গুলি চালিয়ে হত্যা করে রুবেল ও মিথুন। এ মামলায় তাদের মৃত্যুদণ্ড দেন আদালত। তবে তার আগেই ১৪ লাখ টাকার বিনিময়ে নথি জাল করে জামিন নেয় তারা। ২০১১ সালের ২৭ জানুয়ারি তারা কারাগার থেকে বের হয়। জালিয়াতি ধরা পড়লে বাতিল হয় জামিন। এ সময় তাদের জামিন আবেদনকারী কথিত আইনজীবী মুনিরুল ইসলাম ও মনির হোসেনকেও খুঁজে পাওয়া যায়নি। তারা বারের তালিকাভুক্তির যে আইডি নম্বর দিয়েছিলেন, তাও ছিল ভুয়া। পরে জালিয়াতিতে জড়িত দুই আইনজীবী মনিরুজ্জামান ও ফারুক আহমেদকে গ্রেফতার করে ডিবি পুলিশ। তাদের কাছে বিভিন্ন আদালতের প্রচুর জাল সিল পাওয়া যায়।

রিপ্লে করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here