শাবি ও সিকৃবিতে আতঙ্কের নাম ‘পরিচয় পর্ব’

0
60

চলতি বছরের ২১ জানুয়ারির ঘটনা। উদ্ভ্রান্তের মতো খালি পায়ে নিচে নেমে এসেছেন ছাত্রীটি। চারতলার গ্যালারি রুম থেকে কাঁদতে কাঁদতেই বেরিয়ে আসেন। সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (সিকৃবি) ক্যাম্পাসের অনেকেই এ ঘটনা প্রত্যক্ষ করেন। উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে আবাসিক হলে কাঙ্ক্ষিত সিটও পেয়েছিলেন তিনি। হলে ওঠার পরপর তিনি ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হন। সিনিয়ররা ‘পরিচয় পর্ব’তে ডেকে নিয়ে তাকে মানসিক নির্যাতনসহ শারীরিকভাবেও লাঞ্ছিত করেন। অর্থনীতি বিভাগের সেদিনের ঘটনার পর ডিন কাউন্সিলের তৎকালীন আহ্বায়ক অধ্যাপক আবুল কাশেম স্বাক্ষরিত ‘জরুরি বিজ্ঞপ্তি’তে সিকৃবিতে র‌্যাগিং বন্ধে পুনঃসতর্কতা জারি করা হয়। তবে জড়িতদের বিরুদ্ধে কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এ প্রসঙ্গে অধ্যাপক কাশেম সমকালকে বলেন, শাস্তি দেওয়ার চেয়েও আমাদের মূল উদ্দেশ্য র‌্যাগিং বন্ধ করা। ঘটনার পর জড়িতদের ডেকে এনে কাউন্সিলিং করা হয়েছে। ভবিষ্যতে এ ধরনের কাজ না করার অঙ্গীকার করেছে তারা।

সম্প্রতি বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বুয়েট) আবরার ফাহাদকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় সিকৃবিতে র‌্যাগিং বন্ধে পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন অধ্যাপক আবুল কাশেম। গত বছরের অভিজ্ঞতার পাশাপাশি বুয়েটের ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে সতর্কতা অবলম্বন করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন সিকৃবির প্রক্টর ড. সোহেল মিয়া। তিনি বলেন, তুলনামূলক ছোট বিশ্ববিদ্যালয় হওয়ায় এখানে সবাই সবাইকে চেনেন। বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা ছাড়া সিকৃবি র‌্যাগিংমুক্ত।

সিলেট বিভাগে সর্বোচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়েও (শাবি) নবীনদের আতঙ্কের বিষয় ‘পরিচয় পর্ব’। নতুন শিক্ষার্থী ভর্তির পর পরিচয় পর্বের নামে এখানে চলে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন। বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষার্থীরা জানিয়েছেন, শাবিতে মানসিক নির্যাতন বেশি হয়। এমনকি আবাসিক হলের পাশাপাশি বিভিন্ন মেসেও নতুন শিক্ষার্থীদের পরিচয় পর্বের বিভীষিকার মুখোমুখি হতে হয়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক শাবির কয়েকজন শিক্ষার্থী জানান, ক্যাম্পাসে নবীন শিক্ষার্থী আসার পর থেকে তাদেরকে ডেকে নেন সিনিয়ররা। তাদের রুমে নিয়ে প্রথমেই কীভাবে ক্যাম্পাসে অন্যের সঙ্গে পরিচিত হবে- শেখানোর নামে বিভিন্ন ব্যক্তিগত ও বিব্রতকর প্রশ্ন করা হয়। এসব প্রশ্নের উত্তর মনের মতো না হলে মিথ্যা অভিযোগ তুলে নবীন শিক্ষার্থীদের নামে প্রক্টরের কাছে ফোন করার অভিনয় করা হয়। কখনও কখনও শিক্ষার্থীদের মা-বাবার মোবাইল নম্বর নিয়ে তাদের কাছে অভিযোগ করার ভয় দেখানো হয়।

এক বছরের জন্য নবীন শিক্ষার্থীদের সিকৃবি ক্যাম্পাসের শহীদ মিনারের টিলায় উঠতে নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। কয়েকজন শিক্ষার্থী জানান, পরিচয় পর্বে রোবটিক স্টাইলে পরিচয় দেওয়া, প্রত্যেক সিনিয়রকে আলাদা করে সালাম-আদাব দেওয়া, নাগিন ডান্স করানোসহ ব্যক্তিগত বিভিন্ন প্রশ্ন করে নাজেহাল করা হয়। এ সময় উত্তর মনমতো না হলে হাতজোড় করে এক পায়ে দীর্ঘক্ষণ দাঁড় করিয়ে রাখা বা ৪০ বার সালাম দেওয়ানোর মতো নির্মমতাও চলে। তারা জানান, ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগের আধিপত্য থাকলেও র‌্যাগিংয়ে জড়িত মূলত এক বছরের সিনিয়ররা। কখনও কখনও নতুন শিক্ষার্থীকে র‌্যাগিং করা নিয়ে সিনিয়রদের মধ্যেও বিরোধ দেখা দেয়। এমন বিরোধের জেরে অনেক সময় হাতাহাতি থেকে সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটেছে।

এই দুটি বিশ্ববিদ্যালয়ে অতীতে র‌্যাগিংয়ের শিকার হয়েছেন এমন চারজন শিক্ষার্থী জানান, প্রাথমিকভাবে পরিচয় পর্বে কাউকে হেনস্তা করতে ব্যর্থ হলে কান ধরে ওঠবস করানো বা এক পায়ে দাঁড় করিয়ে রাখা হয়। এমনকি দিয়াশলাইয়ের কাঠি দিয়ে রুমের দৈর্ঘ্য-প্রস্থ ও উচ্চতা পরিমাপ করতেও বলা হয়। সিকৃবির একাধিক শিক্ষার্থী জানান, আবাসিক হলে ওঠার পর প্রথমদিকে কাপড় পরা নিয়েও সিনিয়রদের নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়তে হয়েছে। এ জন্য কয়েক মাস হলের ভেতরে জিন্স প্যান্ট বা আরামদায়ক পোশাক পরা সম্ভব হয়নি।

শাবির চতুর্থ বর্ষের এক শিক্ষার্থী জানান, তাকে র‌্যাগিংয়ের সময় শুধু আন্ডারওয়্যার রেখে বাকি সব কাপড় খুলে ফেলতে বাধ্য করা হয়েছে। ছাদ থেকে ফেলে দেওয়ার কথা বলে চোখ বেঁধে হলের ছাদে নেওয়ার অভিনয় বা কোনো মেয়েকে প্রেমের প্রস্তাব দেওয়ার জন্য মানসিক চাপ দেওয়ার ঘটনাও ঘটে অহরহ। মানসিক চাপে অনেকে লেখাপড়ায় মন বসাতে পারেন না বলে জানিয়েছেন ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীরা। গত বছর এক নবীন শিক্ষার্থীকে মেসে অর্ধ-উলঙ্গ করে ছবি তুলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ায় পাঁচজনকে বহিস্কার করে শাবি প্রশাসন। সম্প্রতি র‌্যাগিং কিছুটা কমলেও ছাত্রলীগের কোনো কর্মসূচিতে অংশ না নিলে হুমকি-ধমকিসহ মারধর করার অভিযোগ রয়েছে। কোটা সংস্কার আন্দোলন, নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের কথা বলায় শাবির অনেক শিক্ষার্থী মারধরের শিকার হয়েছেন।

কোটা সংস্কার আন্দোলনের শাবি শাখার আহ্বায়ক নাসির উদ্দিন বলেন, তাকে একটা রুমে একদিন চার ঘণ্টা, আরেক দিন ৬ ঘণ্টা অবরুদ্ধ করে রাখা হয়েছিল। এ ছাড়া আন্দোলন করায় মোবাইল ফোন পর্যন্ত কেড়ে নিয়েছিল ছাত্রলীগ।

গণমাধ্যমে কথা বলায় ছাত্রলীগের কয়েকজন তাকে মারধর করে বলে জানিয়েছেন কোটা সংস্কার আন্দোলনের যুগ্ম আহ্বায়ক নোমান খন্দকার। তিনি জানান, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে মৌখিকভাবে বিষয়টি জানালেও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

এসব নির্যাতনের কারণে শিক্ষার্থীদের মনোজগতে ভয়ঙ্কর প্রভাব ফেলতে পারে বলে জানিয়েছেন নগরীর বেসরকারি নর্থইস্ট মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. সিদ্ধার্থ পাল। সমকালকে তিনি বলেন, অনেকে র‌্যাগিংয়ের শিকার হয়ে চিকিৎসা নিতে বাধ্য হয়েছে। তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পর নতুন পরিবেশে এসেই র‌্যাগিংয়ের শিকার হলে দীর্ঘমেয়াদে তার প্রভাব পড়ে। ভয়ে অনেকে কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ করে না। ফলে অনেক ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষ পরিস্থিতির ভয়াবহতা সম্পর্কে জানতে পারে না।

সিকৃবির প্রক্টর ড. সোহেল মিয়া বলেন, নবীন শিক্ষার্থীরা যাতে সবার সঙ্গে সহজে মিশে যেতে পারে, সে জন্য ওরিয়েন্টেশন ও নবীনবরণ অনুষ্ঠান হয়। এ ছাড়া যে কোনো সমস্যায় হল প্রভোস্ট, সহকারী প্রভোস্ট ও প্রক্টরিয়াল বডিকে জানাতে বলা হয়।

রিপ্লে করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here