দশ বছরে রেলে গচ্চা ১০,৯৮১ কোটি টাকা:

বিপুল বিনিয়োগ, তবুও লোকসানের রেকর্ড

0
51
রেলওয়ের হিসাব শাখার তথ্য অনুযায়ী, গত ১০ বছরে সংস্থাটির পরিচালন ব্যয় হয়েছে ২০ হাজার ৫১৭ কোটি টাকা। বিপরীতে আয় হয়েছে ৯ হাজার ৫৩৬ কোটি টাকা। ফলে এ সময়ে রেল লোকসান করেছে ১০ হাজার ৯৮১ কোটি টাকা।

লোকসানে অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়েছে রেল। গত ১০ বছরে প্রায় ৫৩ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগের পরও রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাটি লাভ দূরে থাক, পরিচালন ব্যয়ই তুলতে পারছে না।

রেলওয়ের হিসাব শাখার তথ্য অনুযায়ী, গত ১০ বছরে সংস্থাটির পরিচালন ব্যয় হয়েছে ২০ হাজার ৫১৭ কোটি টাকা। বিপরীতে আয় হয়েছে ৯ হাজার ৫৩৬ কোটি টাকা। ফলে এ সময়ে রেল লোকসান করেছে ১০ হাজার ৯৮১ কোটি টাকা।

শুধু ২০১৮-১৯ অর্থবছরে এক হাজার ৮১০ কোটি টাকা লোকসান করেছে রেল। তবে সাড়ে তিন মাস আগে অর্থবছর শেষ হলেও, এখনও গত বছরের আয়-ব্যয়ের হিসাব চূড়ান্ত করতে পারেনি রেল। আগামী সপ্তাহে যে হিসাব প্রকাশ করতে যাচ্ছে সংস্থাটি, তার তথ্য অনুযায়ী ২০১৮ অর্থবছরে পরিচালন বাবদ তিন হাজার ১৯৯ কোটি টাকা ব্যয় করেছে রেল। আয় করেছে এক হাজার ৩৮৯ কোটি টাকা।

রেলের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা অবশ্য বলছেন, সব দেশেই রেল লোকসান দিয়ে চলে। বাংলাদেশও ব্যতিক্রম নয়। যাত্রীসেবা প্রধান লক্ষ্য হওয়ায় রেল কখনই লাভের মুখ দেখবে না। তবে এখন যেসব প্রকল্প চলছে, তা বাস্তবায়নের পর লোকসান কমে আসবে।

২০১৭-১৮ অর্থবছরে রেলের পরিচালন ব্যয় ছিল দুই হাজার ৭১৬ কোটি টাকা। বিপরীতে আয় করে এক হাজার ২৯৮ কোটি টাকা। লোকসান ছিল এক হাজার ৪১৮ কোটি। এ বছর লোকসান বেড়েছে ৪০০ কোটি টাকা। তবে এই হিসাব নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। রেলের হিসাব শাখা এক হাজার ৩৮৯ কোটি টাকা আয়ের তথ্য দিলেও অপারেশন শাখার দাবি, আয় এক হাজার ৫৯২ কোটি টাকা। অপারেশন শাখার তথ্য সঠিক হলেও লোকসান এক হাজার ৬০০ টাকার বেশি, যা অতীতের যে কোনো সময়ের চেয়ে বেশি।

বাকি ২০৩ কোটি টাকা কোথায়? তার জবাব পাওয়া যায়নি দুটি শাখা থেকেই। রেলের মহাপরিচালক শামসুজ্জামান সমকালকে বলেছেন, টাকায় গরমিল হওয়ার সুযোগই নেই। হয়তো এখনও সব আয়ের তথ্য সমন্বয় হয়নি। কিংবা ব্যাংক হিসাবে জমা পড়া টাকা এখনও সমন্বয় হয়নি।

রেল সচিব মোফাজ্জেল হোসেন বলেছেন, এমন কিছু হয়ে থাকলে নিয়মের ব্যত্যয় হয়েছে। বিষয়টি তার জানা নেই। তিনি রেলের হিসাব ও অপারেশন শাখার সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন। তবে রেলে হিসাব শাখা বলছে, তাদের তথ্যই ঠিক।

রেলের হিসাব বিভাগের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা সমকালকে বলেছেন, রেলের ব্যাংক হিসাবে এক হাজার ৩৮৯ কোটি টাকা জমা পড়েছে। তারা এটিকেই আয় হিসেবে দেখিয়েছেন। অপারেশন শাখা এক হাজার ৫৯২ কোটি টাকা দেখিয়েছে। তাদের টাকা খরচের এখতিয়ার নেই। ফলে আয় হলে টাকা তাদের কাছেই আছে।

অর্থবছরের সাড়ে তিন মাস পার হলেও হিসাব চূড়ান্ত করতে বিলম্ব ও গরমিল সম্পর্কে হিসাব শাখা থেকে জানা গেছে, এই বিভাগের এক হাজার ৩৪৭টি পদের মধ্যে ৬৭৫টিই শূন্য। জনবলের অভাবে বছরের এক-তৃতীয়াংশ পার হচ্ছে হিসাব শেষ করতে।

পরিচালন ব্যয়ের বাইরেও বিপুল বিনিয়োগ করা হয়েছে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে। ২০০৯-১০ থেকে ২০১৮-১৯ অর্থবছর পর্যন্ত ১০ বছরে ৫৩ হাজার কোটি টাকা খরচ করা হয়েছে। এর মধ্যে ৩৩ হাজার কোটি টাকা খরচ করা হয়েছে প্রকল্প বাস্তবায়নে। চলতি অর্থবছরে বরাদ্দের প্রস্তাব রয়েছে ১৬ হাজার ৫৩৩ কোটি টাকা।

৩৩ হাজার কোটি টাকা খরচ করেও ১০ বছরে রেলের আয় ৫৮৪ কোটি টাকা থেকে বেড়ে মাত্র এক হাজার ৩৮৯ কোটি টাকা হয়েছে। ১০ বছরে ২৪ প্রকল্প বাস্তবায়ন হয়েছে বলে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ দাবি করছে। তাতেও রেলের আয় বাড়েনি। অপারেশন শাখার কর্মকর্তারা বলছেন, আয় বেড়েছে দুই দফা ভাড়া বাড়ানোর কারণে। বিপুল অর্থ বিনিয়োগ এবং ভাড়া বাড়লেও বাড়েনি ট্রেনের গতি। বছর বছর গতি আরও কমছে। উত্তরবঙ্গের ট্রেনে বিলম্ব নিত্যদিনের ঘটনা।

এত বিপুল বিনিয়োগের পরও লোকসান কেন- জানতে চাইলে রেলের মহাপরিচালক শামসুজ্জামান সমকালকে বলেছেন, রেলে বড় বিনিয়োগ শুরু হয়েছে ২০১৬-১৭ অর্থবছর থেকে। এর আগে বড় অঙ্কে বরাদ্দ পাওয়া যায়নি। রেল এখন একটি অন্তর্বর্তী সময় পার করছে। পদ্মা সেতুতে রেলসংযোগ, যমুনা রেলসেতু, ঢাকা-চট্টগ্রাম ডাবল লাইনের মতো মেগা প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নের পর বিনিয়োগের সুফল পাওয়া শুরু হবে।

তবে রেল সূত্র জানাচ্ছে, ২০২১ সালে পদ্মা সেতু দিয়ে মাওয়া-ভাঙ্গা অংশে ট্রেন চলাচলের সম্ভাবনা থাকলেও পুরো প্রকল্প শেষ হতে ছয় বছর লাগবে। যমুনা রেল সেতুর অর্থায়নের বিষয়টি এখনও নিশ্চিত করা যায়নি। ঢাকা-চট্টগ্রাম ডাবল লাইনের কাজ শেষ হতেও অন্তত চার বছর লাগবে। তাই কবে বিনিয়োগের সুফল আসবে তার নিশ্চয়তা নেই।

রেল এমন সময়ে লোকসানের রেকর্ড গড়ে চলছে যখন যাত্রীসংখ্যা বাড়ছেই। শুধু ঈদ উৎসব নয়, বছরের যে কোনো সময়ই রেলের টিকিট পাওয়া কঠিন। অপারেশন শাখার হিসাবে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে রেলওয়ে ৯ কোটি ২৭ লাখ যাত্রী পরিবহন করেছে। আগের অর্থবছরে যাত্রী ছিল ৭ কোটি ৭৮ লাখ। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে যাত্রী পরিবহন থেকে এক হাজার ৩১ কোটি ১৫ লাখ টাকা আয় করেছে রেল।

রেলওয়ের মহাপরিচালক বলছেন, যাত্রী পরিবহন থেকে লাভ করা তাদের উদ্দেশ্য নয়। পৃথিবীর কোনো দেশেই যাত্রী পরিবহন লাভজনক নয়। বাংলাদেশেও যাত্রী পরিবহনে ভর্তুকি দেওয়া হয়। কিন্তু রেলের হিসাব শাখার তথ্য অনুযায়ী, যাত্রী পরিবহনে লোকসান নয়, বরং লাভ করে রেল। যাত্রীবাহী ট্রেন পরিচালনায় ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ট্রেন চালাতে খরচ হয়েছে ৭৭৮ কোটি টাকা। বিপরীতে আয় হাজার কোটি টাকার বেশি। পরিচালন ব্যয়ের বাকিটা যাচ্ছে কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের বেতন ভাতায়।

কিন্তু বিপরীত চিত্র পণ্য পরিবহনে। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে চার হাজার ৩৫৩ টন পণ্য পরিবহন করে রেল। গত বছর তা কমে হয়েছে চার হাজার ১৬৫ টন। এ থেকে রেলের আয় হয়েছে ৩১৪ কোটি টাকা। ২০০১-২০০২ অর্থবছরেও পণ্য ও যাত্রী পরিবহনের আয় ছিল প্রায় সমান। ১৬ বছর পর পণ্য পরিবহনে আয় কমে দাঁড়িয়েছে যাত্রী পরিবহনের এক-তৃতীয়াংশ।

রেলের মহাপরিচালক বলেছেন, পণ্য পরিবহন সড়কনির্ভর হয়ে পড়ায় রেলের আয় কমেছে। চট্টগ্রাম বন্দরের মাত্র ৮ শতাংশ পণ্য পরিবহন হয় রেলের মাধ্যমে। এক দশক আগেও যা ছিল ১২ শতাংশ। শামসুজ্জামান বলেছেন, ঢাকার কমলাপুরের আইসিডির পণ্য ওঠানামার সক্ষমতা কম। গাজীপুরের ধীরাশ্রমে নতুন আইসিডি নির্মাণের পর পরিস্থিতির উন্নতি হবে।

রেল কর্মকর্তারা বলছেন, পণ্য পরিবহন কমে যাওয়ায় লোকসানের বোঝা ভারী হচ্ছে বছর বছর। রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান বলে পণ্য পরিবহনের চেয়ে লোকসানি যাত্রী পরিবহনে গুরুত্ব দিতে হচ্ছে। পরিবহন বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, যাত্রী পরিবহনে পৃথিবীর সব দেশের রেলই লোকসান করে। বাংলাদেশও তার ব্যতিক্রম নয়। লোকসান পোষানো হয় পণ্য পরিবহনে। বাংলাদেশে রেলে পণ্য পরিবহন কমে যাওয়ায় লোকসান বাড়ছে।

রেলে পণ্য পরিবহন কমে যাওয়া ও লোকসানের অন্যতম কারণ কোচ (বগি), ওয়াগন ও ইঞ্জিন সংকট। ২০১১ সাল পর্যন্ত আগের ১০ বছরে কোনো ইঞ্জিন কেনা হয়নি। রেলমন্ত্রী নুরুল ইসলাম সুজনের দেওয়া সাম্প্রতিক হিসাব অনুযায়ী, রেলের ২৭৮টি ইঞ্জিনের ১৯৫টির আয়ুস্কাল শেষ হয়েছে। যাত্রীবাহী এক হাজার ৬৩৫টি বগির ৯০০টির আয়ুস্কাল শেষ হয়েছে। অবকাঠামো উন্নয়নে গুরুত্ব দেওয়া হলেও বগি ও ইঞ্জিন সংগ্রহে ধীরগতি চলছে রেলে।

২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের পর থেকে এখন পর্যন্ত যাত্রীবাহী বগি কেনা হয়েছে ২৭০টি। পণ্যবাহী ওয়াগন কেনা হয়েছে ৪৪৬টি। ইঞ্জিন সংগ্রহ করা হয়েছে ৪৬টি। ভারত থেকে আনা হচ্ছে আরও ২০টি ইঞ্জিন। তবে চাহিদার তুলনায় তা অনেক কম। রেলে পণ্যবাহী আট হাজার ৬৮০টি ওয়াগনের মধ্যে তিন হাজার ৯৩৯টির আয়ুস্কাল পেরিয়ে গেছে।

রেলে বর্তমানে সোয়া লাখ কোটি টাকার ৪৮টি প্রকল্প চলছে। অধিকাংশই অবকাঠামো উন্নয়নের। তবে এসব প্রকল্পের ব্যয় নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। রেলের মহাপরিচালক বলেন, অতিরিক্ত ব্যয় বলে কিছু নেই। রেলে কিছু ‘লিকেজ’ রয়েছে। সেগুলো বন্ধ হয়ে গেলে, বিনিয়োগের সুফল পাওয়া যাবে।

রিপ্লে করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here